খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি
খাগড়াছড়িতে আশির দশকে নির্মিত হয়েছে আঞ্চলিক ও জেলা মহাসড়ক। পাহাড় কেটে অনেকটা অপরিকল্পিতভাবে তাড়াহুড়ো করে এসব সড়ক নির্মাণ করায় শুরু থেকেই অনিরাপদ ও ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি সড়কের বাঁকগুলো। এক সময় পাহাড়ি এলাকায় জনসংখ্যা কম থাকায় যান চলাচলও কম ছিল। তবে পর্যটনসহ পাহাড়ে কৃষি ও বনজ দ্রব্য পরিবহনের কারণে পাহাড়ি সড়কে যান চলাচল বেড়ে যায়। ব্যস্ত হয়ে উঠে পাহাড়ি সড়ক। বাড়েনি সড়কের প্রশস্ততা, কমেনি বাঁক। অতি ঝূঁকিপুর্ণ বাঁকই ৯০ শতাংশ দুর্ঘটনার কারণ। এসব বাঁক যেন মরণ ফাঁদে পরিণত হয়েছে।
খাগড়াছড়ি সড়ক ও জনপদ বিভাগ সূত্র মতে,গত বছরে খাগড়াছড়ির বিভিন্ন সড়কে অন্তত শতাধিক মালবোঝাই ও যাত্রীবাহী গাড়ি উল্টে যায়। বাঁকের কারণে বিপরীত দিক থেকে আসা গাড়ি দেখতে না পেয়ে মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে। খাগড়াছড়ির আলুটিলা-মাটিরাঙা সড়ক, খাগড়াছড়ি -দীঘিনালা সড়ক, খাগড়াছড়ি-বাঘাইছড়ি সড়ক, খাগড়াছড়ি-রামগড় সড়ক, খাগড়াছড়ি-তাইন্দং সড়কে সবচেয়ে বেশি বাঁক রয়েছে। মাটিরাঙা থেকে আলুটিলা হয়ে খাগড়াছড়ির জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত ছোট বড় বাঁকের সংখ্যা ১০০টি। এর মধ্যে এক তৃতীয়াংশই ঝুঁকিপুর্ণ। সবচেয়ে বেশি বাঁক খাগড়াছড়ি-দীঘিনালা জেলা মহাসড়কে।
সূত্রটি আরও জানায়,‘ খাগড়াছড়ির অধিকাংশ সড়ক নির্মিত হয়েছে ১৯৮০’র দশকে । সে সময় অনেকটা অপরিকল্পিত ও তাড়াহুড়ো করে পাহাড় কেটে এসব সড়ক নির্মাণ করা হয়। ফলে সড়ক হয় সরু এবং অতিরিক্ত বাঁক সম্পন্ন । পাহাড়ি সড়কে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকের কারণে যানবাহন চলাচল অত্যন্ত ঝুঁকিপুর্ণ হয়ে উঠেছে।
বাঁশ ও কাঠ পরিবহনে নিয়জিত ট্রাকচালক মো. জামাল হোসেন বলেন, প্রায় ২০ কি.মি. এ সড়কে বাঁকের সংখ্যা ১০৮টি। এটি জেলার সবচেয়ে ব্যস্ততম সড়ক হিসেবে বিবেচিত। এ সড়কে দীঘিনালা ছাড়াও পর্যটন কেন্দ্র সাজেক,বাঘাইছড়ি ও লংগদুগামী যানবাহন চলাচল করে। প্রতিদিন গড়ে শতাধিক বাঁশ ও কাঠ বোঝাই ট্রাক যাতায়াত করে। নিয়ম অনুযায়ী জেলা মহাসড়কের প্রশস্ততা হবে ১৮ ফুট। কিন্ত খাগড়াছড়ির বিভিন্ন উপজেলার সাথে সংযোগকারী জেলা মহাসড়কের প্রশস্ততা মাত্র ১২ ফুট। তিনি আরও বলেন, আমরা নিয়মিত গাছ ও বাঁশ পরিবহন করি। গাছ ও বাঁশ বোঝাই করে এসব সড়কে চলতে গেলে বিপরীত দিক থেকে কোন গাড়ি আসলে ঠিকভাবে ক্রস করা যায় না। রাস্তাটি আরো বড় করলে আমাদের চলাচলে সুবিধা হবে।
যাত্রীবাহী বাস চালক ইলিয়াছ বলেন, এসব সড়কে একসাথে দুটো ট্রাক বা যাত্রীবাহী বাস চলাচল করতে পারে না। বিপরীত দিক থেকে আসা ভারী যানবাহন চলাচলেও বিঘ্ন ঘটে। সরু সড়কে ভারী যানবাহন চলাচলের কারণে সিএনজি,মাহেন্দ্র , মোটরসাইকেল, জীপসহ অন্যান্য ছোট পরিবহন চলাচলে সমস্যা হয়। অনেক সময় মুখোমুখি সংঘর্ষও ঘটে।
পর্যটকবাহী জীপ চালক মোহাম্মদ আলী জানান , এ সড়কে আমাদের সামনেই অনেক গাড়ি দুর্ঘটনায় পড়েছে। প্রতিমাসে গড়ে ১০ থেকে ২০টি গাড়ি দুর্ঘটনায় পড়ে। কেবল বাঁকের কারণে এসব গাড়ি উল্টে যায়। আমার অনেক ঝুঁকি নিয়েই্ এই রাস্তায় গাড়ি চালাই।’
সিএনজি চালক নুর আলম বলেন ‘ খাগড়াছড়ি -দীঘিনালা রাস্তা ছোট এবং টার্নিং বেশি। এছাড়া সাজেক পর্যটন কেন্দ্রে প্রচুর গাড়ি যাতায়াতের কারণে যানবাহনের চাপ বেশি । রাস্তা চিকন হওয়ার কারণে বিপরীত দিক থেকে আসা গাড়ি দেখা যায় না। ফলে অনেক সময় দুর্ঘটনা ঘটে। রাস্তাটা চওড়া করলে আমরা দুর্ঘটনা থেকে বাঁচতে পারব। ’
সড়ক প্রশস্ত করণ ও বাঁক সরলীকরণে ট্রপোগ্রাফিক সার্ভে করছে সড়ক ও জনপদ বিভাগ । এছাড়াও ২০১৯-২০ অর্থবছরে খাগড়াছড়ি-চট্টগ্রাম আঞ্চলিক মহাসড়কের কিছু জায়গা প্রশস্ত করলেও পুরোটা এখনো প্রশস্ত হয়নি। পাহাড়ি সড়কে দুর্ঘটনা রোধে আঞ্চলিক ও জেলা মহাসড়কগুলোও দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার দাবি পরিবহন নেতাদের।
খাগড়াছড়ি সড়ক পরিবহন চালক সমবায় সমিতির কার্যনির্বাহী সদস্য মিন্টু কুমার দত্ত বলেন, খাগড়াছড়ি জেলার সাথে সম্পৃক্ত উপজেলা সড়কগুলো অধিকাংশ স্থানেই সরু। সড়কের প্রশস্ততা বাড়ালে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমবে।
খাগড়াছড়ি সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের সভাপতি আবুল কাশেম ভুইঁয়া বলেন, পাহাড়ের সবকটি সড়ক প্রশস্ত করা জরুরি। এতেকরে সড়ক দুর্ঘটনা অনেকটাই হ্রাস পাবে।
খাগড়াছড়ি ট্রাক মালিক সমিতির সভাপতি হাজী মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন জানান, সড়ক প্রশস্তকরণের পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ বাকগুলো সরলীকরণে উদ্যোগ নিয়েছে সড়ক ও জনপদ বিভাগ। ইতোমধ্যে খাগড়াছড়ি-চট্টগ্রাম আঞ্চলিক মহাসড়কে কিছু রাস্তা প্রশস্ত করলেও পুরোটা হয়নি। এছাড়া জেলা মহাসড়কও প্রশস্ত হয়নি। এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করছি।
খাগড়াছড়ি সড়ক ও জপনদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মাকসুদুর রহমান জানান, প্রথমতঃ দুর্ঘটনা রোধে মহা সড়কের পাশের ঝোপ-ঝাড় পরিষ্কার ও ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকে একদিক থেকে অন্য দিক দেখতে উত্তল আয়না প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। যা সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সহায়ক হবে।জেলা মহাসড়কগুলো প্রশস্ত করা প্রয়োজন। ইতোমধ্যে আমরা ট্রপোগ্রাফিক সার্ভের কাজ শুরু করেছি। সার্ভারের কাজ শেষ হলে আমরা প্রকল্প প্রস্তুত করে উর্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাব। প্রকল্পটি অনুমোদন হলে পাহাড়ের পরিবেশগত প্রভাব নিরুপণ করে আঞ্চলিক মহাসড়কগুলো ২৪ ফুট প্রশস্ত করা হবে এবং জেলা মহাসড়ক ১৮ ফুট প্রশস্ত করা হবে।
Leave a Reply